প্যারিসের রাজপথে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া। মুখঢাকা বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পুলিশ। স্টান গ্রেনেডের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন কিশোর-কিশোরীরা। কখনও তার পরিণতি আরও ভয়াবহ। ফ্রান্সে বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কঠোর পদ্ধতি আবারও আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।
পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সংঘাত এড়ানোর উপর জোর দেওয়া হয়। ফ্রান্সের ছবিটা দীর্ঘদিন ধরেই আলাদা। সেখানে সামাজিক আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের মোকাবিলায় পুলিশি বলপ্রয়োগের নজির বারবার সামনে এসেছে। কখনও সেই বলপ্রয়োগের মাত্রা নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
এর পিছনে রয়েছে ফ্রান্সের ইতিহাস, রাজনীতির কাঠামো, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। কয়েক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতির প্রভাব আজও ফরাসি রাজপথে স্পষ্ট।
রাষ্ট্রের কর্তৃত্বই শেষ কথা?
ফ্রান্সের পুলিশি ব্যবস্থার শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় নেপোলিয়নের আমলের কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক দর্শনে। এই কাঠামোয় পুলিশ মূলত রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কার্যকর করার একটি প্রতিষ্ঠান। আইন প্রয়োগ, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখাই তার প্রধান দায়িত্ব।
ব্রিটেনের মতো দেশের ঐতিহাসিক পুলিশি ধারণার সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। সেখানে পুলিশের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে জনসাধারণের সেবা এবং মানুষের সম্মতির ভিত্তিতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ধারণার সঙ্গে যুক্ত।
ফরাসি ব্যবস্থায় পুলিশ রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতিনিধি। ফলে বড় বিক্ষোভ, অবরোধ কিংবা ব্যাপক বিশৃঙ্খলাকে অনেক সময় শুধু জনজীবনের অসুবিধা হিসেবে দেখা হয় না; সেগুলিকে প্রজাতন্ত্রের কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনার বদলে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করাই পুলিশের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে।
এর প্রতিফলন দেখা যায় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন কৌশলে। বিক্ষোভকারীদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা, তাঁদের চলাচল সীমিত করা এবং তথাকথিত ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে তাই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশে যে ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, ফ্রান্সে তার কিছু এখনও ব্যবহৃত হয়।
উদাহরণ হিসেবে রয়েছে ‘ডিফেন্স বল লঞ্চার’, যা থেকে ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ মাইল বা ৩০০ কিলোমিটার বেগে রবারের প্রজেক্টাইল ছোড়া যায়। তবে এগুলিকে শুধু ‘রবারের গুলি’ বলে বর্ণনা করলে আঘাতের ঝুঁকির বিষয়টি আড়ালে থেকে যায়। কাছ থেকে বা শরীরের সংবেদনশীল অংশে আঘাত লাগলে গুরুতর ক্ষতি হতে পারে।
‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত বিস্ফোরক গ্রেনেড নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে পরিবেশ আন্দোলন চলাকালীন এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর ঘটনাও পুলিশি অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। পরে ওই ধরনের কিছু গ্রেনেডের ব্যবহার বন্ধ করা হলেও তার জায়গায় এসেছে পাইরোটেকনিক স্টান গ্রেনেড।
তীব্র শব্দ ও বিস্ফোরণের অভিঘাতে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার জন্য তৈরি এই গ্রেনেড ব্যবহারের ফলে গুরুতর আঘাতের একাধিক ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। কারও চোখের দৃষ্টি নষ্ট হয়েছে, কারও দাঁত বা চোয়াল ভেঙেছে, আবার কারও অঙ্গচ্ছেদের প্রয়োজন হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার ভিড়ের মধ্যে আতঙ্কও ছড়াতে পারে।
বিপ্লবের উত্তরাধিকার, রাজপথের শক্তি
ফ্রান্সের বিক্ষোভ-সংস্কৃতিও এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে পরবর্তী গণআন্দোলনের ইতিহাসে রাজপথ বারবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই ঐতিহ্য থেকে তৈরি হয়েছে এমন একটি ধারণা—বিপুল জনসমাগম ও ধারাবাহিক প্রতিবাদ সরকারকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করতে পারে।
জার্মানি বা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে শ্রমিক সংগঠন ও সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্সেও শ্রমিক সংগঠনগুলির শক্তিশালী ঐতিহ্য রয়েছে, কিন্তু সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সমঝোতা সব সময় সহজে গড়ে ওঠে না।
পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অনেকটাই কেন্দ্রীভূত। ফলে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনমতের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য তৈরি হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছনো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজপথের আন্দোলন নাগরিকদের কাছে সরকারকে চাপে ফেলার অন্যতম কার্যকর উপায় হয়ে ওঠে। ফ্রান্সে বিক্ষোভকে তাই অনেকে শুধু অসন্তোষ প্রকাশের মাধ্যম নয়, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবেও দেখেন।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয় সংঘাতের দুষ্টচক্র। সরকার যখন বড় জমায়েতকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে দেখে, তখন পুলিশি উপস্থিতি ও বলপ্রয়োগ বাড়তে পারে। তাতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়ায় এবং উগ্র গোষ্ঠীগুলি আরও সংঘাতমুখী হয়ে উঠতে পারে।
অন্য দিকে, হিংসাত্মক গোষ্ঠীগুলিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করার বদলে যদি নির্বিচারে বলপ্রয়োগ করা হয়, তা হলে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তখন প্রতিবাদ ও পুলিশি অভিযানের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যেখানে পরিস্থিতি কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নেয়।
বিক্ষোভ বেশি, না সংঘাত বেশি?
অ্যাকলেডের মতো সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণে দেখা যায়, পশ্চিম ইউরোপে বিক্ষোভের সংখ্যার নিরিখে ফ্রান্স সব সময় শীর্ষে থাকে না। জার্মানি ও ইতালিতেও বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভ হয়।
তবে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে বিক্ষোভের হিংসাত্মক সংঘাতে রূপ নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। ব্যারিকেড তৈরি, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সরাসরি সংঘর্ষ—এসবই সেই বৃহত্তর সমস্যার অংশ।
অর্থাৎ, শুধু কতগুলি বিক্ষোভ হচ্ছে, তা দিয়ে পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বিক্ষোভ কী ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, পুলিশ কী ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে এবং সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সমঝোতার সুযোগ কতটা রয়েছে, সেগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
ফ্রান্সের পুলিশি কার্যকলাপ ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে বহু বছর ধরে সমালোচনা করে আসছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং কাউন্সিল অব ইউরোপের মতো সংস্থা।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গ্রেনেড ও রবারের প্রজেক্টাইলের অনুপযুক্ত ব্যবহার, গণগ্রেফতার এবং অহিংস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগের অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে।
এত সমালোচনা সত্ত্বেও এই নিরাপত্তাব্যবস্থার মৌলিক কাঠামো বহাল রয়েছে। বরং পুলিশকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গত মাসে হাজার হাজার মানুষ একটি প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। তাঁদের অভিযোগ, আইনটি কার্যকর হলে পুলিশ ও জঁদারমেরি বাহিনীর সদস্যদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা কমে যাবে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কর্তব্যরত অবস্থায় তাঁরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হবে যে তা আত্মরক্ষার জন্য করা হয়েছে।
নাগরিক অধিকার সংগঠন, বামপন্থী রাজনীতিক, বিচারকদের সংগঠন এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, আইনটি কার্যকর হলে পুলিশের গুলি চালানো প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ছিল কি না, তা প্রমাণ করার দায় আরও বেশি করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের উপর পড়তে পারে।
বিরোধীদের মতে, এতে পুলিশের জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্য দিকে, এই ধরনের প্রস্তাবের সমর্থকেরা পুলিশকর্মীদের নিরাপত্তা ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রশ্ন: পুলিশকে কী পরিমাণ ক্ষমতা দেওয়া উচিত এবং সেই ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হওয়া প্রয়োজন?
রাষ্ট্রের শক্তি, গণতন্ত্রের পরীক্ষা
ফ্রান্সের রাজপথের সংঘাতকে শুধু পুলিশের কঠোরতা কিংবা বিক্ষোভকারীদের হিংসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ধারণা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রীকরণ, প্রতিবাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, হিংসা ঠেকানো এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা এবং পুলিশের বলপ্রয়োগকে প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক সীমার মধ্যে রাখাও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে সংঘাতের চক্র আরও গভীর হতে পারে। ফ্রান্সের বর্তমান বিতর্ক তাই শুধু পুলিশ কী ভাবে বিক্ষোভ সামলায়, সেই প্রশ্ন নয়। বরং বড় সামাজিক অসন্তোষের মুখে রাষ্ট্র কতটা আলোচনায় আগ্রহী, ভিন্নমতকে কতটা জায়গা দেয় এবং নিজের ক্ষমতার উপর কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে—সেই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরীক্ষারও প্রতিফলন।